মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার শোলঘর এলাকায় প্রায় ৮০ বছরের পুরোনো একটি ঐতিহ্যবাহী বসতভিটা নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও জমির মালিক লুৎফে হাবিবের অভিযোগ—আদালতে নিষেধাজ্ঞা ও একাধিক রায় তাদের পক্ষে থাকা সত্ত্বেও জেলা প্রশাসনের ক্ষমতাবলে জায়গাটি ‘খাস’ দেখিয়ে সেখানে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রধান উপদেষ্টার বরাবর লিখিত অভিযোগও করেছেন।
অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, প্রকৃত জমির মালিকদের কোনো নোটিশ না দিয়ে গত ৫ জানুয়ারি জেলা প্রশাসনের লোকজন তাদের জমিতে প্রবেশ করে তড়িঘড়ি করে একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি শুধু মালিকানার অধিকারে হস্তক্ষেপ নয়—বরং ঐতিহ্যবাহী বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টার প্রথম ধাপ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শোলঘরের ওই বসতবাড়ির চারপাশে দোকানঘর ও বসতঘর রয়েছে। পূর্ব পাশে কয়েকটি বসতঘরে যেসব পরিবার বসবাস করছেন, স্থানীয়দের মতে তারাই ওই জমির প্রকৃত মালিক ও দীর্ঘদিনের দখলদার। ভুক্তভোগীদের দাবি, এলাকাটিতে আগে থেকেই একটি ১২ ফুট প্রশস্ত রাস্তা রয়েছে। তবুও ২০২৫ সালে ‘রাস্তা প্রশস্তকরণ’-এর যুক্তিতে জমির একটি অংশ সরকারিভাবে খাস দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে—একটি “বিশেষ ব্যক্তির” বাড়িতে যাতায়াত সুবিধা বাড়াতেই ১২ ফুট রাস্তা ২৪ ফুট করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, আর সেই লক্ষ্যেই ঐতিহ্যবাহী বাড়িসহ আশপাশের জায়গা খাস দেখিয়ে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
লুৎফে হাবিব জানান, শোলঘর পালবাড়ির ওই জমির পরিমাণ ২৪ শতাংশ। এই জমির মালিকানা রয়েছে তাদেরই পরিবারের পাঁচ সদস্য—লুৎফে হাবিব, নাইমা হাবিব, ইমরান হাবিব, নাছিমা হাবিব ও কাজী রুবেল-এর নামে; সবাই একই পরিবারের সদস্য। বংশগত সূত্রে প্রায় ৮০ বছর ধরে তারা ওই জায়গায় বসবাস করছেন। তার দাবি, এস.এ. রেকর্ডীয় মালিকদের ওয়ারিশদের কাছ থেকে হস্তান্তরসূত্রে ১৯৪৩ সাল থেকেই তাদের মালিকানা চলে আসছে এবং সেই সময় থেকেই পরিবারগুলো ঘরবাড়ি নির্মাণ করে সেখানে বসবাস করে আসছে। পরবর্তী সময়ে ওয়ারিশরা ১০–১২টি পাকা ঘর নির্মাণ করে বসবাস ও ভাড়ার ব্যবস্থাপনাও চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই জায়গা নিয়ে টানাপোড়েন নতুন নয়। ২০০৭ সাল থেকে একটি প্রভাবশালী মহল তাদের দখলীয় সম্পত্তির কিছু অংশে রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা করে আসছে—এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। ওই সময় এলাকাবাসীর প্রতিবাদে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলেও পরে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। তৎকালীন জেলা প্রশাসককে দিয়ে সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, শ্রীনগর, মুন্সীগঞ্জে একটি দেওয়ানি মামলা করা হয় বলে তারা জানান। সিনিয়র সহকারী জজ আদালত ২০০৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ডিক্রির মাধ্যমে মামলা খারিজ করেন। পরে জেলা প্রশাসক আপিল করলেও অতিরিক্ত জেলা জজ ২০২৪ সালের ৭ জুলাই ও ১১ জুলাই রায় ও ডিক্রি দিয়ে আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন।
এরপর জেলা প্রশাসক ওই রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়ানি রিভিশন করেন। হাইকোর্টের একক বেঞ্চ ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট রায় ও আদেশে ৭/২০০৭ নম্বর স্বত্ব মামলা পুনর্বিবেচনার জন্য নিম্ন আদালতে পাঠান। সেই আদেশের কিছু পর্যবেক্ষণের বিরুদ্ধে পক্ষগণ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন—যা বর্তমানে বিচারাধীন বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ আরও তীব্র। শোলঘর পালবাড়ির স্থায়ী বাসিন্দা সৈয়দ শামসুল আলম (ওরফে পীর খোকন) বলেন, “এক পরিবারের সুবিধার জন্য ১২ ফুট রাস্তা ২৪ ফুট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিকল্প রাস্তা থাকা সত্ত্বেও ঐতিহ্যবাহী বাড়িঘর ভেঙে খাস করার চেষ্টা ক্ষমতার অপব্যবহার।” তার দাবি, আদালতের রায়কে কার্যত অমান্য করে ২৪ শতাংশ জমি খাস দেখিয়ে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে—যার ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যে, জমিটির এস.এ/সি.এস খতিয়ান ও দাগ নম্বরও উল্লেখ করা আছে—সি.এস খতিয়ান নং ২১৮৪, এস.এ খতিয়ান নং ১৪৫৯ ও ১৪৬০, এস.এ খতিয়ান নং ২৪৬ ও ২৭২৪, সি.এস দাগ নং ৩১৬৮ এবং এস.এ দাগ নং ৬০৭৩সহ আরও কিছু রেকর্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাদের অভিযোগ, ২৪ শতাংশ জমির মধ্যে সরকার ইতোমধ্যে ১২ শতাংশ ‘খাস’ দেখিয়ে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে।
এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক নূরে আলম আশরাফী বলেন, “এখানে অন্যায়ভাবে কিছুই করা হয়নি। সরকার নিয়মনীতি অনুসরণ করেই জমি খাস করেছে।” তবে কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না—এ বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে চাননি। তিনি আরও জানান, “আইনানুগভাবে ওই জায়গায় সাইনবোর্ড ঝুলানো হয়েছে। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে বসার কথা বলেছি।”
অন্যদিকে শ্রীনগর থানার সহকারী কমিশনার (ভূমি) গোলাম রব্বানী সোহেল বলেন, ২০২৫ সালে পালবাড়ির ওই জমি সরকার খাস করে। রাস্তা প্রশস্ত করার জন্যই জেলা প্রশাসক ৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছেন। তবে ওই জমির ওপর আদালতের কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে কি না—সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন বলেও জানান।
শোলঘরের এই ঐতিহ্যবাহী বসতভিটা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে—রাস্তা প্রশস্তকরণের নামে ব্যক্তি-সুবিধার অভিযোগ কতটা সত্য, আর আদালতে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ‘খাস’ দেখিয়ে সাইনবোর্ড টাঙানোর সিদ্ধান্ত কতটা আইনসঙ্গত। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, তারা ন্যায্য বিচার ও বসতভিটার সুরক্ষা চান; অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, তারা নিয়ম মেনেই পদক্ষেপ নিয়েছে।
0 Comments