জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট ঢাকা দক্ষিণ কমিশনারেটের আওতাধীন তেজগাঁও বিভাগীয় দপ্তরের কাওরানবাজার সার্কেলে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী কর্মচারী সিন্ডিকেট ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের মূল নেতৃত্বে রয়েছেন দুই কর্মচারী—আজিজুল ইসলাম (সিপাই) ও মো. তাইজুল ইসলাম (সিপাই)।
অভিযোগ রয়েছে, তারা নিজেদের কর্মকর্তার পরিচয়ে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ঘুষ আদায় করছেন এবং রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে ঘুষের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। জানা গেছে, এই দুই কর্মচারী যেখানেই পোস্টিং পান, সেখানেই সিন্ডিকেট তৈরি করে ভুয়া পরিচয়ে ঘুষ আদায়ের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন করেন।
অফিস সময়ের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে বা মিথ্যা পরিচয় দিয়ে অর্থ আদায় করেন তারা। এমনকি এনবিআর ঐক্য পরিষদের আন্দোলনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানের পদত্যাগ দাবি করেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, আজিজুল ও তাইজুল অনলাইনে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান এবং মেম্বার বেলাল হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে গোপনে প্রচারণা চালিয়েছেন। তিনি বলেন, "তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।" একাধিকবার অভিযোগ জানানো হলেও দক্ষিণ কমিশনারেট কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা জানান, কাওরানবাজার হার্ডওয়্যার ক্যাবোকাস মার্কেটের প্রায় ৪০০ দোকানদার প্রতিমাসে নিয়মিত ভ্যাট (৯.১ ফর্মে) জমা দিলেও, অতিরিক্ত ঘুষ দিতে বাধ্য হন। প্রত্যেক দোকান থেকে প্রতি মাসে গড়ে ৬০ হাজার টাকা ঘুষ সংগ্রহ করা হয় আজিজুল-তাইজুল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। এমনকি অনেক সময় তারা অতিরিক্ত ৩০ হাজার টাকাও দাবি করেন।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, "কাওরানবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পাইকারি মার্কেটে এমন দুর্নীতি চললে প্রকৃত রাজস্ব আদায় ব্যাহত হয়। দেশের বৃহৎ অংশের ব্যবসা এখান থেকে সরবরাহ হয়, অথচ কর্মচারীরা ঘুষের টাকায় বাণিজ্য করছে।"
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, এই সিন্ডিকেট কাওরানবাজার সার্কেলের অধীনস্থ বহু প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত ঘুষ আদায় করে। এর মধ্যে রয়েছে—
মেসার্স ফোর এঞ্জেল, এয়ারকম এলিভেটেড, আলফা ইন্স্যুরেন্স, অনিক, আনোয়ার টেক, অন্তর ড্রিঙ্কিং, এনি কার সলিউশন, আরবান, এএস ইলেকট্রনিকস, এশিয়া ইলেকট্রনিকস, অটোম্যান ফিটনেস, আয়ান হার্ডওয়্যার, বসু বিজনেস, বিডি ট্রেডিং, বেটাটেক এনার্জি লিমিটেড, বিক্রমপুর সুইটমিট, ক্যাফে আলী রেস্টুরেন্ট, ক্যাপিটাল গেস্ট, কসমো ট্রেড, ক্রিয়েটিভ, দেওয়ান ইঞ্জিনিয়ারিং, ফুলকোলি সুইটনেট অ্যান্ড বেকারি, গিয়ারআপ, হাবিব ইলেকট্রনিকস, হক বেকারি, হোটেল আল মাহবুব, হোটেল রূপালী বাংলা, আইএল ট্রেডার্স, ইসমাইল ইলেকট্রনিকস, যমুনা ট্রান্সপোর্ট, মেঘনা অটোমোবাইল, মেঘনা বেয়ারিংসহ আরও বহু প্রতিষ্ঠান।
ব্যবসায়ীরা বলেন, "আমরা নিয়মিত ভ্যাট দিই, কিন্তু সরকারি কর্মচারীরাই রাজস্ব কমিয়ে ঘুষে ভাগ বসাচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।"
এই দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন কাওরানবাজারের ব্যবসায়ীরা।
এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
0 Comments