ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে 'উপসহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার' পদে চলতি দায়িত্ব প্রদানে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। টেকনিক্যাল জ্ঞানের অভাব থাকা সত্ত্বেও নন-টেকনিক্যাল কর্মচারীদের হাতে জরিপ ও রেভিনিউ ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে, যা আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
গত ১৫ অক্টোবর, ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ অধিশাখা-১ এর উপসচিব এম এম জাহাঙ্গীর হোসেন স্বাক্ষরিত ৩১৬ নম্বর প্রজ্ঞাপনে মোট ৪৫৫ জনকে 'উপসহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার' পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছেন—
সেটেলমেন্ট বিভাগের সার্ভেয়ার, ড্রাফটস্ম্যান কাম এরিয়া এস্টিমেটর কাম সিট কিপার ৭৩ জন,
এবং নন-টেকনিক্যাল রেকর্ড কিপার, খারিজ সহকারী, কপিষ্ট কাম বেঞ্চ সহকারী ১৩০ জনসহ আরও অনেকে।
এই নিয়োগে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ এর বিধি ২৬, ২৭ ও ২৮ অনুসারে রাজস্ব ক্ষমতাও প্রদান করা হয়েছে—যা প্রশাসনিক ও আইনি উভয়ভাবেই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত।
হাইকোর্টের আদেশ অমান্য
২০১৯ সালের নিয়োগবিধি অনুযায়ী, উপসহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার পদে পদোন্নতির যোগ্য পদ হলো সাব-সার্ভেয়ার, কম্পিউটার, ড্রাফটস্ম্যান ও বাউন্ডারি আমীন। কিন্তু ২০২৩ সালের নতুন নিয়োগবিধিতে এই চার পদধারীদের পদোন্নতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়।
ফলে তারা রিট মামলা নং ১৬৭৮৫/২০২৩ দায়ের করলে ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি হাইকোর্ট ৩৩টি পদ সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। কিন্তু ওই আদেশ লঙ্ঘন করে গত ১৫ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনে ৪৫৫ জনকে চলতি দায়িত্ব প্রদান করা হয়—যা সরাসরি আদালত অবমাননার শামিল।
অনিয়ম ও আর্থিক বাণিজ্য
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপসহকারী সেটেলমেন্ট অফিসারের মোট পদ ৬১৮টি—এর মধ্যে ৫০% সরাসরি নিয়োগ, বাকী ৫০% পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ হওয়ার কথা।
বর্তমানে ১০৩টি পদ শূন্য থাকলেও ৪৫৫ জনকে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। 'চলতি দায়িত্ব নীতিমালা-২০২৩'-এর স্পষ্ট বিধান অনুযায়ী, শূন্য পদের সংখ্যার বাইরে কোনো দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ ১০৩ পদের বিপরীতে ৪৫৫ জনকে দায়িত্ব প্রদান একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়ম।
অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, প্রত্যেক কর্মচারীর কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে ঘুষ আদায় করা হয়েছে। ফলে প্রায় ২২ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (নিয়োগ) বিধিমালা-২০১৪ এর ধারা ৩০(২) অনুযায়ী, অস্থায়ী দায়িত্ব কেবল নিকটস্থ নিম্নতর পদধারীকে দেওয়া যায়। কিন্তু ভূমি মন্ত্রণালয় ১৪, ১৫, ১৬ গ্রেড থেকে ১০ গ্রেডে সরাসরি দায়িত্ব দিয়ে এই বিধান লঙ্ঘন করেছে।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ এর ২৪(২) ধারা অনুযায়ী, রাজস্ব ক্ষমতা কেবল কর্মকর্তারাই প্রয়োগ করতে পারেন—কর্মচারীরা নন।
ফলে নন-টেকনিক্যাল কর্মচারীদের রাজস্ব ক্ষমতা প্রদান বাংলাদেশ সেটেলমেন্ট রেকর্ডস ম্যানুয়াল ও ভূমি রাজস্ব বিধিমালা উভয়ের পরিপন্থী।
প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতিরও লঙ্ঘন
সুপ্রিম কোর্টের দুটি মামলায়—
কেএম হাবিবুর রহমান বনাম বাংলাদেশ (২০১৬)
সেকেন্দার আলী বনাম বাংলাদেশ (২০১৮)
—রায়ে বলা হয়েছে, "চলতি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা বিচারিক বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন না।"
তবুও চলতি দায়িত্বপ্রাপ্তদের রেভিনিউ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে, যা ন্যায়বিচারের মূলনীতির পরিপন্থী।
অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া ও অভিযোগ
তেজগাঁওস্থ ভূমি ভবনের সূত্রে জানা গেছে, এই চলতি দায়িত্বের প্রস্তাব অধিদপ্তরের ভেতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষরকারী উপসচিব এম এম জাহাঙ্গীর হোসেন এর বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন,
"যাদের ডিজিটাল জরিপ বা নকশা তৈরির কোনো প্রশিক্ষণই নেই, তাদের দিয়ে ডিজিটাল জরিপ পরিচালনা করানো হচ্ছে। এটা রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এবং মন্ত্রণালয়ের সুনামহানিকর।"
আইন, নীতিমালা ও আদালতের আদেশ অমান্য করে নন-টেকনিক্যাল কর্মচারীদের হাতে ডিজিটাল জরিপ ও রেভিনিউ ক্ষমতা তুলে দেওয়ার ঘটনায় ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। অভিযোগ উঠেছে, এই অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে।
সুশাসন ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার স্বার্থে বিষয়টির দ্রুত তদন্ত ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
0 Comments