সিলেট–৬ আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে তীব্র অসন্তোষ, পুনর্বিবেচনার দাবিতে সরব তৃণমূল




নিজস্ব প্রতিবেদক:

সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসনে বিএনপির সম্ভাব্য মনোনয়নকে কেন্দ্র করে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। দলের ঘোষিত প্রার্থী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরীকে নিয়ে স্থানীয় নেতা–কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা–সমালোচনা চলছে, যা মনোনয়ন পুনর্বিবেচনার দাবি আরও জোরালো করেছে।

৩ নভেম্বর বিকেলে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সিলেট-১, সিলেট-২, সিলেট-৩ ও সিলেট-৬ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর মধ্যেই সিলেট-৬ আসনে এমরান আহমদ চৌধুরীর নাম ঘোষণার পর এলাকাজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

ঘোষণার পরপরই বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জে নেতা–কর্মীদের একটি অংশ তার গ্রহণযোগ্যতা, অতীত রেকর্ড এবং নির্বাচনী সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। বিয়ানীবাজার উপজেলা বিএনপির এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—
"তিনি সাংগঠনিকভাবে দক্ষ হলেও ভোটের রাজনীতি বোঝেন না। এতে দলের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।"

গোলাপগঞ্জের আরেক নেতা বলেন—
"মনোনয়ন ঘোষণার পর মানুষ হতাশা প্রকাশ করছে। এমন পরিস্থিতি আগে দেখা যায়নি।"

গত শনিবার জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিয়ানীবাজার উপজেলা ও পৌর বিএনপির ব্যানারে আয়োজিত আলোচনা সভায়ও প্রার্থী পুনর্বিবেচনার দাবি ওঠে। সভায় বক্তারা সিলেট-৬ আসনে 'নিরপেক্ষ রিভিউ' করে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী চূড়ান্ত করার জন্য দলের কেন্দ্রীয় উচ্চপর্যায়ের প্রতি অনুরোধ জানান।

অনেক নেতা–কর্মীর মতে, ২০১৪ সালের গোলাপগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এমরান আহমদ চৌধুরী জামায়াতের প্রার্থীর কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন। তারা বলেন—
"উপজেলা পর্যায়ে জিততে না পারা একজন নেতাকে জাতীয় নির্বাচনে দাঁড় করানো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।"

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবি ও বিতর্কিত আচরণও তৃণমূলের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে। অভিযোগ রয়েছে—নিজ এলাকার কর্মীদের নিয়ে মাঠে না নেমে তিনি অন্য উপজেলা থেকে লোক এনে প্রচারণা চালানোর চেষ্টা করছেন, ফলে তার সঙ্গে স্থানীয়দের দূরত্ব আরও বেড়েছে।

এ ছাড়া গত বছরের আগস্টে 'শহীদদের হত্যা মামলাকে কেন্দ্র করে মামলাবাণিজ্য'-এর অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এ নিয়ে এলাকায় তীব্র জনরোষ তৈরি হয় এবং কিছু নেতা–কর্মী অভিযোগ করেন, ওই ঘটনায় এমরান আহমদের সংশ্লিষ্টতা ছিল। তাদের মতে—এমন স্পর্শকাতর অভিযোগ বহনকারী একজন প্রার্থীকে নিয়ে মাঠে নামা কঠিন হয়ে যাবে।

গত ৪৫ বছরে সিলেট-৬ আসনে বিএনপি কখনো বিজয়ী হতে পারেনি। ২০০1 সালের নির্বাচনে বিজয়ী স্বাধীন প্রার্থী সৈয়দ মকবুল হোসেন লেচু মিয়া পরে বিএনপিতে যোগ দিলেও তিনি স্বতন্ত্র প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার জনসেবামূলক ভূমিকার কারণে স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ তাঁর মেয়ে সৈয়দা আদিবা হোসেনকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চায়। তাদের মতে, তিনি তরুণ ও নারী ভোটারদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। অন্যদিকে দলের আরেকটি অংশ ২০১৮ সালের প্রার্থী ব্যবসায়ী ফয়সাল আহমেদ চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি করছে, কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন ও স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

স্থানীয় নেতা–কর্মীরা মনে করেন, সিলেট-৬ অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন এবং এখানে জামায়াত শক্ত প্রার্থী দিয়েছে। তাই প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল হলে এর মূল্য দলকে দিতে হবে। এক উপজেলা পর্যায়ের নেতা বলেন—
"ভুল প্রার্থী দিলে আসন হারাতে হবে। এমন কাউকে চাই যিনি ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং ভোট টেনে আনতে সক্ষম।"

মনোনয়ন ঘোষণার পর যে নীরবতা ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে, তাতে স্পষ্ট—সিলেট-৬ আসনের লড়াই এখনো স্থিতিশীল নয়। তৃণমূলের বড় অংশ বিশ্বাস করে, প্রার্থী পুনর্বিবেচনা করা হলে এবং গ্রহণযোগ্য কাউকে মনোনয়ন দিলে বিএনপি এই আসনে প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থানে ফিরতে পারে।

এ বিষয়ে বিএনপির সম্ভাব্য মনোনীত প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন—
"ছাত্রদল থেকে রাজনীতি শুরু করেছি। জেলা ছাত্রদলের সভাপতি থেকে শুরু করে বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলাম। এখন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। দলের সব পর্যায়ের নেতা–কর্মী আমার পক্ষে আছেন। অল্প কয়েকজন অভিমান করে থাকলেও তারাও দ্রুত ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধ হবেন।"

Post a Comment

0 Comments