ক্ষতিপূরণ না দিয়েই সঞ্চালন লাইনের কাজ শত শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগে ট্রান্সরেলকে ঘিরে তোলপাড়
নিজস্ব প্রতিবেদক
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য নির্মাণাধীন সঞ্চালন লাইন প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ না দিয়েই কাজ এগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেড এবং প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃক সিংয়ের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ করা হয়েছে। প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা, জমি ও গাছের ক্ষতিপূরণ, নির্মাণকাজের মান এবং কর পরিশোধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—ক্ষতিপূরণ খাতে প্রকল্পে মোট কত টাকা বরাদ্দ ছিল, কত টাকা ছাড় করা হয়েছে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে কত টাকা বিতরণ করা হয়েছে? প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক নথি এবং ক্ষতিপূরণ বিতরণের তালিকা যাচাই করলেই এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি সূত্র জানায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালনের জন্য প্রায় ৪৬৪ কিলোমিটার ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ চলছে। দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পটি কয়েকটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০২ কিলোমিটার রূপপুর-বগুড়া লাইন, ১৪৪ কিলোমিটার রূপপুর-গোপালগঞ্জ লাইন, ১৪৭ কিলোমিটার রূপপুর-ঢাকা লাইন এবং ৫১ কিলোমিটার আমিনবাজার-কালিয়াকৈর লাইন।
নদী পারাপারের জন্যও পৃথকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ছয় কিলোমিটার পদ্মা নদী পারাপার এবং সাত কিলোমিটার যমুনা নদী পারাপার লাইন রয়েছে। একইভাবে ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ৬০ কিলোমিটার রূপপুর-বাঘাবাড়ী লাইন, ১৪৫ কিলোমিটার রূপপুর-ধামরাই লাইনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন সঞ্চালন প্রকল্পে ভারতীয় কয়েকটি বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এর মধ্যে ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেড, লারসেন অ্যান্ড টুব্রো লিমিটেড (এলঅ্যান্ডটি) এবং কেইসি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড উল্লেখযোগ্য।
দুদকে দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, টাঙ্গাইল থেকে ধামরাই পর্যন্ত প্রায় ৮২ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলাকায় সঞ্চালন লাইন নির্মাণের সময় জমি ব্যবহার ও গাছ কাটার কারণে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত জমি ও গাছের মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা থাকলেও অনেকেই এখন পর্যন্ত সেই অর্থ পাননি।
অভিযোগপত্রে ফুলচান, মো. নবী, সুমা আক্তার ও আদুরীসহ কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, শুধু কয়েকজন নয়, এভাবে শত শত মানুষ ক্ষতিপূরণের অর্থ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, কাজ শুরুর সময় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে সঞ্চালন লাইন ও টাওয়ার নির্মাণের কাজ শেষ বা শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে, কিন্তু তাঁদের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।
এ ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন ক্ষতিপূরণের অর্থের হিসাব। প্রকল্পে ক্ষতিপূরণের জন্য মোট কত টাকা বরাদ্দ ছিল, সেই অর্থের কত টাকা ছাড় করা হয়েছে, কোন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অর্থ বিতরণ করা হয়েছে এবং কতজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
অভিযোগে জমি ব্যবহার করেও যথাযথ ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, সঞ্চালন টাওয়ার নির্মাণের জন্য তাঁদের জমি ব্যবহার করা হলেও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়ে তাঁরা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, জমি ও গাছের হিসাব নেওয়া হলেও পরবর্তীতে ক্ষতিপূরণের অর্থ কবে এবং কীভাবে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, সঞ্চালন টাওয়ার নির্মাণের কারিগরি মান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু এলাকায় টাওয়ার নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় গভীরতার তুলনায় কম গভীরতায় পাইলিং করা হয়েছে। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় কম সিমেন্ট এবং নিম্নমানের রড ব্যবহারের অভিযোগও করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা, বিল অব কোয়ান্টিটি, পাইলিং রেকর্ড এবং নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষার ফলাফল পরীক্ষা করা প্রয়োজন। রূপপুরের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত সঞ্চালন লাইন নির্মাণে কারিগরি মানের প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের একাধিক সূত্রের অভিযোগ, ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেডের কাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। একটি সূত্রের দাবি, প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং বিপুল অর্থ বাংলাদেশ থেকে বাইরে পাচারের অভিযোগও উঠেছে। তবে ব্যাংকিং লেনদেন, বৈদেশিক অর্থপ্রদান এবং প্রকল্পের আর্থিক নথি তদন্ত ছাড়া এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য সঞ্চালন অবকাঠামো সময়মতো প্রস্তুত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিজিসিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সঞ্চালন লাইন ও প্রয়োজনীয় গ্রিড অবকাঠামো প্রস্তুত না হলে বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হলেও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে না।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের প্রকাশিত বিভিন্ন নথিতে ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেডকে বাংলাদেশের একাধিক বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পের পরিবেশ ও সামাজিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সরকারি নথিতেও প্রতিষ্ঠানটির সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে। পিজিসিবির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট একটি প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে ট্রান্সরেলের নাম উল্লেখ করে প্রকল্পের ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতির তথ্য দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রকল্পটির নির্ধারিত সমাপ্তির সময় সেপ্টেম্বর ২০২৬ উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, আগের সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও কমিশনের মাধ্যমে ট্রান্সরেল প্রকল্পের কাজ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে তৎকালীন সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক প্রভাব বা কমিশনের মাধ্যমে কাজ পাওয়ার এসব অভিযোগ স্বাধীন তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ—টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও বিপুল অর্থের প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় অসচ্ছতা দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তাই এ ধরনের প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পে একদিকে বিপুল সরকারি ও বৈদেশিক অর্থ জড়িত, অন্যদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার বিষয়টিও সরাসরি এই সঞ্চালন অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। ফলে ট্রান্সরেলকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ শুধু দুর্নীতির প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক ব্যবহার, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায্য অধিকার, নির্মাণকাজের মান এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে বিশেষভাবে ক্ষতিপূরণ খাতের অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব বের করা জরুরি। কত টাকা বরাদ্দ হয়েছিল, কত টাকা ছাড় হয়েছে এবং সেই অর্থের কতটা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে পৌঁছেছে—এই হিসাব প্রকাশ পেলেই হয়তো ট্রান্সরেলকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মিলবে।
0 Comments